রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, মো. সাহাবুদ্দিন মাফিয়া সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের প্রতি সব সময়ই সমর্থন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করছি।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে চলমান আলোচনা ও গুঞ্জনের মধ্যে বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফেরেন স্পিকার। দেশে ফিরে বিকেল সাড়ে ৫টায় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। বিকেলে তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছায় এবং সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তাঁর অপসারণের দাবি উঠলেও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার প্রায় পাঁচ মাস পর তিনি পদত্যাগ করেন। যদিও তাঁর সাংবিধানিক মেয়াদের এখনও প্রায় পৌনে দুই বছর বাকি ছিল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতাকেই দায়িত্ব ছাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেন। লিখিত ওই পত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।
স্পিকার আরও জানান, পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি তাঁর বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি–সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন। অতীতে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ শনাক্ত হয়েছে, যার ফলে তিনি মাঝে মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়েন।
গত ১২ মার্চ স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে শপথ বাক্য পাঠ করান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া।স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
স্পিকার আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর তা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নথিতে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’
তিনি আরও জানান, স্পিকার হিসেবে শপথ নেওয়ার সময়ই প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও তিনি গ্রহণ করেছিলেন। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন—এমন সাংবিধানিক বিধানও রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনটি সংক্ষিপ্ত রাখেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্ন থাকলেও তিনি মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা গুঞ্জন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, দেশে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চললেও পদত্যাগের মূল কারণ ছিল রাষ্ট্রপতির শারীরিক অসুস্থতা। তিনি রাষ্ট্রপতির সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন সম্পর্কে নিজের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন তুলে ধরেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকেই স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে স্পিকার বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়, যার সঙ্গে দেশের স্বার্থ জড়িত। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্রে নিজেই শারীরিক অসুস্থতার বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। সেখানে হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা এবং মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়ার বিষয়টি লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো চিকিৎসা সনদের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা ধোঁয়াশার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সব ধরনের অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য থাকে না। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং সাংবিধানিক বিধান অনুসারেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তাঁর আশা, এ ঘটনায় সৃষ্টি হওয়া সব ধরনের বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা দূর হবে।

